Mawlana Selim Hossain Azadi

বিদায় হজের ভাষণ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিক মুসলমান মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

Posted on September 1, 2016 | in Article | by

দশম হিজরির নয় জিলহজ। শুক্রবার। আরাফার মরুপ্রান্তরে এক লাখ চব্বিশ হাজার মতান্তরে এক লাখ চুয়াল্লিশ হাজার মানুষের সমাবেশে দ্বিপ্রহরের খানিক পরে হজরত মুহাম্মদ (সা.) এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সৃষ্টির শুরু থেকে অদ্য পর্যন্ত আগত, বিগত পৃথিবীর সব ভাষণের মধ্যে এ ভাষণ শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় সর্বোচ্চ। বিশ্ব মানবতার মুক্তির এমন কোনো দিক নেই, যার ছোঁয়া এই মূল্যবান ভাষণে লাগেনি। মূলত বিদায় হজের ভাষণ মহানবী (সা.)-এর তেইশ বছরের নবুয়তি জীবনের মহান শিক্ষার নির্যাস। তা ছাড়া এ ভাষণ মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর থেকে কেয়ামত অবধি বিপদসংকুল পৃথিবীর উদ্ভূত পরিস্থিতি ও সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান। এ ভাষণ বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার এক পূর্ণাঙ্গ ও বাস্তব কর্মসূচি। ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দিক তুলে ধরা হলো এ লেখায়।

ভাষণের শুরুতে রসুল (সা.) আল্লাহর প্রশংসা করার পর সমবেত জনতাকে লক্ষ্য করে নিজের রিসালাতের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে সাক্ষ্য নেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি তোমাদের কাছে তাবলিগ করেছি? সাহাবিরা সবাই বললেন, হ্যাঁ করেছেন। রসুল (সা.) বললেন, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক। এর পর তিনি সবার উদ্দেশে তার ভাষণ দেন। এ ভাষণ রসুল (সা.) এর পক্ষ থেকে তার নির্বাচিত প্রতিনিধিরা অন্যদের যুগ যুগ শুনিয়ে যাচ্ছেন।

ধর্ম, জাতি, বর্ণবৈষম্যের কারণে হারিয়ে যায় মানবিক মূল্যবোধ। শুরু হয় মানুষের মধ্যে হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি। আজকের বিশ্বে তা কেবলই নিত্যনৈমিত্তিক দুঃখ ভাবনা। তৎকালীন আরবেও এমন পরিস্থিতি ছিল। রসুল (সা.) দীর্ঘ তেইশ বছরের সংগ্রাম সাধনা ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা বলে একটি সুন্দর শান্তিময় রাষ্ট্র গঠন করেছেন। তাই ভাষণের শুরুতেই সবাইকে সজাগ ও সতর্ক করেছেন কোনোভাবেই যেন শান্তি বিনষ্ট না হয়। তিনি (সা.) বলেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! তোমাদের রব একজন। তোমাদের আদি পিতা একজন। প্রত্যেকেই আদমের সন্তান। আর আদম মাটির তৈরি। আল্লাহতায়ালা পারস্পরিক পরিচিতির সুবিধার্থে বিভিন্ন সমাজ ও গোত্রে তোমাদের বিভক্ত করেছেন। আরবের ওপর যেমন অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, তেমনি অনারবের ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই আরবের। একইভাবে শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের আর কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব বা বৈশিষ্ট্য নেই। শ্রেষ্ঠত্ব, বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার একমাত্র ভিত্তি হলো তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির মধ্যে।’

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশে পৃথিবীর রাতগুলোকে যতই দিনের আলোর মতো জ্বলজ্বল করে তোলার চেষ্টা চলছে, ততই মানুষের অন্তঃকরণ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। পৃথিবীর সর্বত্র আজ হত্যা, লুণ্ঠন, ছিনতাই, সন্ত্রাসের রাজত্ব চলছে। মানুষের জানমালের কোনো নিরাপত্তা নেই। ভূলুণ্ঠিত মানবতা নিভৃতে কাঁদছে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানের ব্যাপারে রসুল (সা.) বলেন, ‘হে লোক সকল! তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্মান, তোমাদের সম্পদ পরস্পরের জন্য চিরতরে হারাম করা হলো— যেমন আজকের এই দিন, এই মাস, এই শহরে রক্তপাত করা হারাম বা নিষিদ্ধ।’ নারী অধিকার ও বৈষম্য রোধে রসুল (সা.) বলেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! নারীদের প্রতি নির্মম ব্যবহার করার সময় তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই তোমরা তাদের আল্লাহর নামে গ্রহণ করেছ এবং তাঁরই কালেমার মাধ্যমে তাদের সঙ্গে তোমাদের দাম্পত্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জেনে রেখো, তাদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তোমাদের ওপর তাদেরও অধিকার রয়েছে। সুতরাং তাদের সার্বিক কল্যাণ সাধনের বিষয়ে তোমরা আমার উপদেশ গ্রহণ করো।’ অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য আজকের বিশ্বে নারী সমাজ কোথাও তাদের প্রকৃত অধিকার ও মর্যাদা পাচ্ছে না।

একদল লোক ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। আরেক দল প্রগতির কথা বলে নারীদের প্রকৃত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছে। বর্তমান বিশ্বে শ্রমিক সমস্যা সবচেয়ে দুঃখজনক সমস্যা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রসুল (সা.) শ্রমনীতি ঘোষণা করেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের অধীনদের সম্পর্কে সতর্ক হও। তারা তোমাদের ভাই। তোমরা নিজেরা যা খাও তা তাদের খাওয়াবে। তোমরা নিজেরা যা পরিধান কর তা তাদের পরিধান করাবে। তাদের ওপর সাধ্যাতিরিক্ত শ্রমের বোঝা চাপিয়ে দেবে না। যদি কোনো কারণে চাপিয়ে দিতে হয়, তবে তুমিও তাতে অংশীদার হও।’

মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের ভিত মজবুত করা ও নিরপরাধ মানুষ হত্যা বন্ধের নির্দেশ দিয়ে মহানবী (সা.) বলেন, ‘হে লোক সকল! শুনে রাখ, মুসলমান জাতি পরস্পর ভাই ভাই। আমার অবর্তমানে তোমরা পরস্পর মারামারি ও হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত হয়ে কাফির হয়ে যেও না।’ সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা চিরতরে বন্ধ ঘোষণা করে মহানবী (সা.) বলেন, ‘জাহেলি যুগের সুদব্যবস্থা রহিত করা হলো। এ পর্যায়ে সর্বপ্রথম আমি আমার চাচা হজরত আব্বাসের সুদ মাফ করে দিলাম, আর সেই সঙ্গে গোটা সুদব্যবস্থা আজ থেকে রহিত করা হলো।’ অন্যের অর্থ আত্মসাৎ ও জুলুম-নির্যাতন সম্পর্কে সতর্ক করে রসুল (সা.) বলেন, ‘সাবধান! তোমরা জুলুম করবে না; আর কোনো মুসলমানের ধন-সম্পত্তি থেকে তার সম্মতি ছাড়া কোনো কিছু গ্রহণ করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়।’ ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি ও তার ভয়াবহ পরিণাম উল্লেখ করে রসুল (সা.) বলেন, ‘সাবধান! ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি ও সংঘাতের পথ বেছে নিও না। এই বাড়াবাড়ির ফলেই অতীতে বহু জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।’ সবশেষে মানুষকে কোরআন আঁকড়ে ধরার নসিহত করে রসুল (সা.) বলেছেন— ‘আমি তোমাদের জন্য একটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা এটিকে আঁকড়ে থাকবে, ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। আর এটি হলো আল্লাহর বাণী আল কোরআন। সহি মুসলিমের বর্ণনা এটি। অন্যান্য বর্ণনায় কোরআনের পাশাপাশি রসুলের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার কথা বলা হয়েছে।

পৃথিবীতে আজ সেই একই মুসলমান বাস করছে। তারা কী শ্রমের এবং শ্রমিকের ভাই হতে পারছে? সাদা-কালোর ভেদাভেদ ভুলে সব মানুষকে কী বুকে আঁকড়ে ধরতে পারছে। কোরআনের কটি বাণীর প্রতিফলন ঘটছে মুসলমানের জীবনে! হায়! বিদায় হজের ভাষণ শুধু ভাষণ হয়েই বিরাজ করছে বই-পুস্তকের পাতায়। ফিরে ফিরে আসে হজ। ফিরে ফিরে আসে কোরবানি। কিন্তু বিদায় হজের ভাষণ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় না কোনো মুসলমান।

লেখক : বিশিষ্ট মুফাসিসরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

www.selimazadi.com
see more

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>